ওকি গাড়িওয়াল ভাই কতো রবো আমি পন্থের দিকে চাইয়া রে…’, ‘গ্রামের পথে গরুর গাড়ি, বউ চলেছে শ্বশুর বাড়ি’ এসব এখন গান কিংবা কবিতার চরণ হলেও একসময় তা ছিল বাস্তব। যদিও এমন দৃশ্য এখন দুর্লভ প্রায়।

বিজ্ঞাপন

আধুনিকতার ছোঁয়া, প্রযুক্তিগত উন্নতি ও যান্ত্রিকতা যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। ৩০/৩৫ বছর আগেও যেখানে গরু, ঘোড়া কিংবা মহিষে টানা গাড়ির কদর ছিল।

বিশেষ করে সন্দ্বীপের মত গ্রামীণ জনপদে কৃষি ফসল বহন ও মানুষ বহনের প্রিয় বাহন ছিল দু-চাকার গরুর গাড়ি। সেখানে আজ গ্রামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও এসবের দেখা মেলা ভার। গরুর গাড়ির স্থান দখল করে নিয়েছে ভ্যান, বাস, ট্রাক, অটোরিকশা, নছিমন, করিমন, ইত্যাদি। কৃষকসহ সকল শ্রেণির মানুষ এখন যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের জন্য এ সকল যান্ত্রিক পরিবহণের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রাম জেলার দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে এক সময় গরুর গাড়ির ব্যাপক কদর থাকলেও এখন এর প্রচলন দেখা যায়না বললেই চলে। মাত্র দুই যুগ আগেও ৬৮ কিলোমিটারের চার লক্ষ মানুষের জনপদে কৃষিপণ্য ও মানুষ বহনের প্রিয় বাহন ছিল এই দু-চাকার গরুর গাড়ি। কালের বিবর্তনে আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়ায় প্রয়োজনীয়তা হারিয়ে অধিকাংশ অঞ্চল থেকেই উঠে যাচ্ছে এর প্রচলন। দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ এ বাহন।

গরুর গাড়ির ইতিহাস সুপ্রাচীন। নব্যপ্রস্তর যুগের সময় থেকেই মানুষ এই যানটি ব্যবহার করে আসছে। ফ্রান্সের ফঁতান অঞ্চলে আল্পস পর্বতের উপত্যকায় একটি গুহায় গরুর গাড়ির যে ছবি পাওয়া যায়, তার থেকে জানতে পারা যায় খ্রিস্টের জন্মের ৩১০০ বছর আগে ব্রোঞ্জ যুগেও গরুর গাড়ির অস্তিত্ব ছিল। হরপ্পা সভ্যতাতেও যে গরুর গাড়ির অস্তিত্ব ছিল তার সপক্ষে প্রতœতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানেও নানা অঞ্চল থেকে এক অক্ষবিশিষ্ট চাকাওলা নানা খেলনা পাওয়া গেছে।

এগুলি থেকে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, খ্রিস্টপূর্ব ১৬০০ থেকে ১৫০০ সালের দিকে সিন্ধু অববাহিকা ও ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে গরুর গাড়ির প্রচলন শুরু হয়। যা সেখান থেকে ক্রমে ক্রমে দক্ষিণেও ছড়িয়ে পড়ে।

সাগর বেষ্টিত সন্দ্বীপে মাত্র দুই যুগ আগেও গরুর গাড়ি ছাড়া বিয়েই হতো না। বর-কনেসহ বিয়ে বাড়ির মালামাল পরিবহনে গরুর গাড়ি ছিল উৎকৃষ্ট বাহন। বরপক্ষের লোকজন বরযাত্রী ও ডুলিবিবিরা বিয়ের জন্য ১০ থেকে ১৫টি গরুর গাড়ির ছাওনি সাজিয়ে শ্বশুরবাড়ি ও বাবার বাড়ি আসা-যাওয়া করত। রাস্তাঘাটে গরুর গাড়ি থেকে পটকাও ফুটাত। যেসব পরিবারে গরুর গাড়ি ছিল, তাদের কদরের সীমা ছিল না। কৃষকেরা প্রতিদিন ফজরের আজানের আগে গরুর গাড়িতে কখনো জৈবসার তথা গোবরের সার, কখনো গরুর খাবার ও লাঙ্গল-মই-জোয়াল নিয়ে যেত মাঠে।

গরুর গাড়ির চালককে বলা হয় গাড়িওয়াল। আর তাই চালককে উদ্দেশ্য করে বলত, ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই, আস্তে বোলাও গাড়ি, আরেক নজর দেখিবার নাও মুই দয়ার বাপের বাড়িরে গাড়িয়াল’।

২০ থেকে ২৫ কিলোমিটারের রাস্তা পাড়ি দিয়ে কৃষকেরা জমি চাষাবাদ এবং মালামাল বহনের জন্য গরুর গাড়ি বাহন হিসেবে ব্যবহার করত। অনেক অঞ্চলে রাস্তা পাকা না থাকায় এক সময় যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করত না। ফলে গরুর গাড়িই ছিল একমাত্র ভরসা। তবে বর্তমানে মোটরযানের দাপটে ধীরগতির এই যানটির ব্যবহার অনেক কমে গেছে। তাই এখন আর তেমন চোখেই পড়ে না। কয়েক বছর আগেও কালে ভাদ্রে দু’একটি গরু, ঘোড়ার গাড়ি চোখে পড়লেও বর্তমানে তা ডুমুরের ফুল।

বর্তমান যুগ হচ্ছে যান্ত্রিকতার যুগ। মানুষ বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় মালামাল বহনের জন্য বাহন হিসেবে ব্যবহার করছে ট্রাক, পাওয়ারটিলার, লরি, নসিমন-করিমনসহ বিভিন্ন মালগাড়ি। মানুষের যাতায়াতের জন্য রয়েছে মোটরগাড়ি, রেলগাড়ি, সিএনজি, অটোরিকশা ইত্যাদি। ফলে গ্রামাঞ্চলেও আর চোখে পড়ে না গরুর গাড়ি। অথচ গরুর গাড়ির একটি সুবিধা হলো, এতে কোনো জ্বালানি তেল খরচ হয় না। ফলে ধোয়া হয় না, পরিবেশেরও কোনো ক্ষতি হয় না।

রিকশা বা ঠেলাগাড়ির মতো গরুর গাড়িও একটি পরিবেশবান্ধব যান। এতে কোনো জ্বালানি খরচ নেই। শব্দ দূষণ নেই। তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ এসব কিছুই এই যানে ব্যবহার হয় না। গরুর গাড়ি ধীর গতিতে চলে বলে দুর্ঘটনাও ঘটত না।

কিন্তু কালের বিবর্তণে আজ গরুর গাড়ি শুধুই স্মৃতি। যুগের পরিবর্তনে বিলুপ্তির পথে আজ আবহমান বাংলার আরেকটি ঐতিহ্য। ঐতিহ্যের স্বার্থে হলেও এ বিষয়ে সুচিন্তিত পদক্ষেপ থাকা দরকার বলে মনে করছে সুশীল সমাজ।