আসল মায়ের যুদ্ধ জয়ের হাসি,পুলিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা
৬ মাস পর আসল মায়ের কোলে শুভ, লালিত মায়ের চোখে স্বপ্নভঙ্গের জল

18
৬ মাস পর ভিক্ষুক মা ফিরে পেয়েছে তার হারানো শিশু, অন্যদিকে ৬ মাস ধরে লালিত সন্তানকে ফিরিয়ে দিয়ে অঝর নয়নে কাঁদছে নিঃসন্তান গৃহবধু

২৪ ঘন্টা স্পেশাল : দীর্ঘ ৬ মাস পর ভিক্ষুক মায়ের কোলে ফিরেছে শিশু শুভ। ভিক্ষুক মায়ের অভিযোগের সূত্র ধরে দীর্ঘ ৬ মাসের পুলিশের নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্ঠায় চুরি হওয়া ৬ মাসের শিশুটিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। সে সাথে শিশু পাচারকারী চক্রের মুলহোতাসহ এ চক্রের ২ নারী সদস্যসহ মোট চারজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

শিশু পাচারকারী চক্রের সক্রিয় সদস্যদের গ্রেফতারের পর তাদের দেয়া তথ্যমতে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ভুজপুর থানার কাশেম আলী টেন্ডল বাড়ির দুবাই প্রবাসী সাইফুল্লার নিঃসন্তান স্ত্রী তাসমিনা আক্তার জেলীর হেফাজত থেকে শিশু শুভকে উদ্ধার করে পুলিশ।

শনিবার (২৩ নভেম্বর) দুপুরে নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সংবাদ সম্মেলনে শিশু পাচারকারী চক্রকে গ্রেফতার এবং শিশুটিকে উদ্ধারের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) আমেনা বেগম।

চট্টগ্রামে আর কারো সন্তান এভাবে চুরি বা অপহরণ হয়ে থাকলে পুলিশকে জানানোর জন্য অনুরোধ জানিয়ে আমেনা বেগম বলেন যদি কারো সন্তান অপহরণ বা চুরি হয়ে থাকে তবে এই চক্রের সদস্যদের আবার রিমান্ডে এনে প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তারা আর কোন শিশু অপহরণের সাথে জড়িত কি-না তা খুঁজে বের করা হবে জানিয়েছে আমেনা বেগম।

শনিবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ঘটনার বিবরণে আমেনা বেগম বলেন, শিশু শুভর মা শিরিন বেগম (২৫)’র স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করার পর থেকে ৬ মাস বয়সী শুভ এবং তার সাত বছর বয়সী এক কন্যা সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দিতে ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেচে নন। গত ১৫ মার্চ বিকেলে তিনি চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেড থানাধীন নেভী কলোনী সংলগ্ন ফুটপাতে শিশু শুভকে নিয়ে ভিক্ষা করছিলেন।

শিশু পাচারকারী ২ সদস্য

সেদিন শিরিন বেগমের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কথার ছলে তাকে জুস খাওয়ান দুজন পথচারী। জুস খেয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার পর শিরিন বেগমকে আগ্রাবাদস্থ মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করে আত্মীয় পরিচয়ে শুভকে চুরি করে নিয়ে যায় পাচারকারীরা।

ঘটনার ২দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে গত ১৮ মার্চ ভিক্ষুক মা শিরিন বেগম নগরীর ইপিজেড থানায় তার শিশু পুত্র শুভ অপহরণ হয়েছে উল্লেখ করে এজাহার দায়ের করেন।

মামলা দায়েরের পর থেকেই পুলিশ শিশু উদ্ধারে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার এবং বন্দর থানার ওসি মীর নুরুল হুদা সার্বক্ষণিকভাবে ভিক্ষুক শিরিনের অপহরণ হওয়া শিশু উদ্ধারে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেন। বন্দর থানার এস আই কামাল হোসেন পায় মামলার তদন্তভার।

শিশু শুভর মায়ের কথামতো পুলিশ চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের সেদিনকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে শিশু পাচারকারীচক্রটিকে শনাক্ত করে। গত ২৮ জুলাই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এ চক্রের অন্যতম সদস্য ইকবাল হোসেনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এ চক্রের অন্যতম সদস্য জাফর সাদেকের তথ্য প্রকাশ করে ইকবাল।

তার দেয়া তথ্যমতে বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে গত ৩ নভেম্বর এ চক্রের মুল মাস্টার মাইন্ড জাফর সাদেককে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর শিশুটির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পায় পুলিশ। তার তথ্যের সূত্র ধরে একই দিন এ চক্রের নারী সদস্য পারভিন আক্তারকেও গ্রেফতার করা হয়। গত ২১ নভেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর পাঁচলাইশ থানার শূলকবহর এলাকা থেকে এ চক্রের আরেক নারী সদস্য সালেহা আলেয়াকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

তিনি জানান, পাচারকারী চক্রের তিন হাত বদল হয়ে শিশুটি পৌছে যায় চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ভুজপুর থানার কাশেম আলী টেন্ডল বাড়ির দুবাই প্রবাসী সাইফুল্লার নিঃসন্তান স্ত্রী তাসমিনা আক্তার জেলীর হাতে। তিনি পাচারকারী চক্রের কাছ থেকে মাত্র দেড় লক্ষ টাকার বিনিময়ে শুভকে কিনে নিয়েছিলো। শুক্রবার তার হেফাজত থেকে শিশু শুভকে উদ্ধার করে পুলিশ।

শিশুটি জেলীর হাতে কিভাবে গেলো সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে গ্রেফতার জাফর সাদেকের বরাতে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) আমেনা বেগম বলেন, শিশুটিকে চুরি করে প্রথমে রাখা হয়েছিলো নগরীর মেহেদীবাগস্থ ন্যাশনাল হাসপাতাল ও সিগমা ল্যাবের টেকনোলজিস্ট পারভিন আক্তারের হেফাজতে। সেখান থেকে পাচারকারী চক্রের অপর সদস্য সালেহা বেগম আলেয়ার (৫২) মাধ্যমে শিশুটিকে ফটিকছড়ির এক নিঃসন্তান দম্পত্তির কাছে বিক্রি করে দেন।

নিঃসন্তান গৃহবধু শিশু শুভর লালিত মা তাসমিনা আক্তার জানান, পাচারকারী চক্রের সদস্য আলেয়া তাকে জানায়, শিশুটির মা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর শিশুটিকে দেখাশুনার জন্য কেউ না থাকায় শিশু শুভর পিতা তাকে দত্তক দিতে চাই। এ কথা শুনে শিশুটিকে রাখার আগ্রহ প্রকাশ করলে আলেয়ার এক খালার মাধ্যমে প্রথমে আড়াই লক্ষ টাকা প্রদানের প্রস্তাব করে।

পরে অনেক দেন দরবারে দেড় লক্ষ টাকায় রাজি হলে স্ট্যাম্প করে শিশুটিকে কিনে নেন এবং সন্তানের অভাব পুরণে নিজ সন্তানের মতোই শিশু শুভকে ৬ মাস ধরে লালন পালন করে আসছেন।

তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, দীর্ঘ ৬ মাস ধরে লালন পালন করার পর পুলিশের কাছ থেকেই জানতে পারি শিশুটি চুরি করা হয়েছে। শিশুটির আসল মায়ের কাছে তাকে তুলে দিতে কান্নায় ভেঙে পড়েন জেলী। পুলিশের প্রেস ব্রিফিং-চলাকালীন শুভকে কোলে নিয়ে সারাক্ষণই নিরবে চোখের পানি ফেলছিলেন জেলী।

অপরদিকে দীর্ঘ ৬ মাস পর নিজে হারিয়ে ফেলা সন্তান কোলে পেয়ে আনন্দিত ভিক্ষুক শিরিন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রশাসনের প্রতি।

রাজীব সেন প্রিন্স