সীতাকুণ্ডে জেলেদের জালে ধরা পড়েছে ১৫ লক্ষ টাকা দামের একটি রাজ কাঁকড়া

94

কামরুল ইসলাম দুলু, সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি :
সীতাকুণ্ডে সাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়েছে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা দামের একটি রাজ কাঁকড়া।

বৃহস্পতিবার সীতাকুণ্ড উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের শীতলপুরের মদনহাট এলাকার তপন জল দাশের জালে টি. গিগাস (T.Gigas) প্রজাতির এই রাজ কাঁকড়াটি ধরা পড়ে।

পরে বঙ্গোপসাগরের একমাত্র ‘লিভিং ফসিল’ বা জীবন্ত জীবাশ্ম নামে পরিচিত রাজ কাঁকড়াটি সাগরে অবমুক্ত করা হয়।

তপন জলদাশ বলেন, আমার মাছ ধরার জালে বিলুপ্তপ্রায় মহামূল্যবান রাজ কাঁকড়াটি ধরার পর উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসি। কাঁকড়াটি যে মহামূল্যবান তা আমি আগে থেকে জানতামনা। কয়েকদিন আগে এই কাঁকড়া বিষয়ে চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই খবর পড়ে আমি বিলুপ্তপ্রায় এই রাজ কাঁকড়া সম্পর্কে জানতে পারি। এরপর ঐ পত্রিকার কক্সবাজার প্রতিনিধি সাংবাদিক আহমেদ গিয়াসকে আমার জালে কাঁকড়া আটকের বিষয়টি জানালে তিনি আমাকে এই কাঁকড়া সম্পর্কে বিস্তারিত বলেন এবং কাঁকড়াটি সাগরে অবমুক্ত করার অনুরোধ করলে আমি সেটি সাগরে ছেড়ে দেই। এটি রাজ কাঁকড়া নামে পরিচিত হলেও স্থানীয় জেলেদের ভাষায় বলা হয় দৈত্য কাঁকড়া।

উল্লেখ্য যে, বঙ্গোপসাগরের একমাত্র ‘লিভিং ফসিল’ বা জীবন্ত জীবাশ্ম নামে পরিচিত রাজ কাঁকড়া দেশের সমুদ্র উপকূল থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। অলৌকিক ওষুধী গুণের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এই প্রাণিটির রক্ত ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অত্যন্ত দামী। প্রাণীটি ডাইনোসর যুগেরও আগের বা ৪৫ কোটি বছর পুরনো আদি প্রাণী বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু কিছু শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই প্রাণীটির রক্ত ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করে দিচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

চিকিৎসা শাস্ত্রে রাজ কাঁকড়ার নীল রক্ত এক যাদুকরী ক্ষমতা সম্পন্ন। মানুষের শরীরের দ্রত রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে এবং মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করতে কাঁকড়ার নীল রক্ত অতুলনীয়। এছাড়া এর শরীরের পেছনে থাকা ছোট্ট লেজটি দিয়ে তৈরি করা হয় ক্যান্সারের মহা ওষুধ। এখন চিকিৎসা শাস্ত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা একেকটি রাজ কাঁকড়ার দাম আন্তর্জাতিক বাজারে পনের লক্ষ টাকা এবং প্রতি গ্যালন রক্তের দাম ৬০ হাজার মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশী মূদ্রায় প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সাময়িকী ও গবেষণাপত্রের বরাত দিয়ে জানান কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আশরাফুল হক।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন এর পর্যবেক্ষণেও বাংলাদেশে প্রাণিটির অবস্থান লাল তালিকায়।

সমুদ্র বিজ্ঞানী আশরাফুল হক বলেন, ৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পরেও প্রাণিটিকে বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে সচরাচর দেখা যেত। এমনকি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের একদল শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সীতাকুণ্ডের কুমিরা উপকুলে প্রাণিটিকে দেখেছেন। কিন্তু দামী এই প্রাণিটি সাম্প্রতিককালে প্রকৃতি থেকে এভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সন্দেহজনক ও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সমুদ্র বিজ্ঞানী আশরাফুল হক বলেন, ওষুধ শিল্পের জন্য প্রতি বছর কয়েক কোটি করে রাজ কাঁকড়া শিকারের কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চল থেকেই এই জীবন্ত ফসিলটি হারিয়ে গেছে। অনেক স্থানে এই প্রাণিটির বিলুপ্তির সাথে সাথে এর উপর নির্ভরশীল ওষূধ শিল্প কারখানাও বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, এখনও আমাদের বঙ্গোপসাগরের কিছু এলাকায় রাজ কাঁকড়ার আবাসস্থল টিকে আছে। বাংলাদেশ ছাড়াও প্রজাতি ভেদে ভারত, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্র উপকুল, ইন্দো-প্যাসিফিক, ইন্দোনেশিয়ান, আমেরিকান আটলান্টিক উপকূল এবং মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চলে হর্সশো ক্র্যাব পাওয়া যায়। তবে পুরো বিশ্বেই এটি বিপন্ন।