স্টেশনের ভাসমান মোবাইল বিক্রেতারা তাদের প্রশ্রয়দাতা, টার্গেট পকেট ও ভ্যানিটি ব্যাগ
ওরা ১৫ জন প্রশিক্ষিত ছিনতাইকারী : পুলিশকে দেখালো ৩০ সেকেন্ডে ছিনতাইয়ের কৌশল!

91
ছিনতাইকারী

রাজীব সেন প্রিন্স : ওরা ১৫ জন, অধিকাংশই পথশিশু তবে এরা সবাই সংঘবদ্ধ প্রশিক্ষিত ছিনতাইকারী। ১৫ সদস্যের সংঘবদ্ধ এ ছিনতাইকারী গ্রুপের মধ্যে ১২ জনের বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন থানায় রয়েছে একাধিক চুরি ও ছিনতাই মামলা।

মূলত হাত খরচের টাকা ও যাদের বয়স কম তাদের মাঝে পড়ালেখার আগ্রহ সৃষ্টি করে পড়াশুনার খরচ বাবদ সামান্য কিছু অর্থ প্রদান করে এদেরকে মোবাইল ছিনতাই কাজে উৎসাহ প্রদান করছে নগরীর চট্টগ্রাম রেল স্টেশনসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ভাসমান কয়েকজন মোবাইল বিক্রেতা।

রবিবার মধ্যরাত পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরীর পুরাতন রেলস্টেশনসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ এ ছিনতাইকারী চক্রটির ১৫ সদস্যকেই গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় কোতোয়ালি থানা পুলিশ। এসময় তাদের কাছ থেকে ১২টি চোরাই মোবাইল সেট ও ৪টি ছোড়া উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ জানায়, ছিনতাইকারী গ্রুপটির হাতে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন এমন অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে বিষয়টি শেয়ার করেছে। এমন কয়েকটি ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে ছিনতাইকারী চক্রটির গ্রুপ লিডার রাব্বি আল আহম্মদ (২০)সহ ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

এ গ্রুপের গ্রেফতার অপর সদস্যরা হলেন, মো. মামুন (২৯), মো. সোহাগ (২৬), জয় বড়ুয়া প্রকাশ আব্দুল (১৮), মো. আজিম প্রকাশ আজম (২২), দেলোয়ার হোসেন প্রকাশ দেলু (৩৭), মো. মামুন (১৮), মো. আল আমিন শেখ (২১), মো. রুবেল (৩০), মো. বশির (২৫), মো. মিন্টু (৩০), মো. শাহাদাত হোসেন বাবু (২৮), জয়নাল আবেদীন (১৯), মো. জহির (২৮) ও লেদু প্রকাশ আলাউদ্দিন প্রকাশ হাসান (৩০)।

গ্রেফতারের পর সোমবার সকালে নগরীর মোমিন রোডে সিএমপির দক্ষিণ বিভাগের উপ-কমিশনারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায় নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান।

তিনি জানান, গ্রেফতারকৃতরা ছিনতাইকাজে প্রশিক্ষিত। যাত্রীবাহি বাসে উঠে যাত্রীর গা ঘেঁষে দাড়িয়ে মাত্র ৩০ সেকেন্ড থেকে এক মিনিটের মধ্যেই তার পকেট থেকে মোবাইল হাওয়া করে দেওয়ার মতো যাদুকরী কৌশল এরা রপ্ত করেছে। তাছাড়া কোন নারী পথচারীকে একা পেলে মুহুর্ত্বের মধ্যে ওই নারীর আশে পাশে জটলা পাঁকিয়ে এক মিনিটের মধ্যেই তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে মোবাইল ছিনতাই চম্পট দিতেও এরা বেশ পারদর্শী।

নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মেহেদী হাসান মোবাইল ছিনতাইয়ের শিকার ব্যাক্তিদের উদ্দ্যেশে বলেন, ফেসবুকে স্ট্যাটাস না দিয়ে মোবাইল চুরির অভিযোগে সরাসরি থানায় এসে অভিযোগ দায়ের করলে মোবাইলটি উদ্ধারে এবং ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার করতে সহজ হয়।

সংবাদ সম্মেলনে সিএমপির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) শাহ মুহাম্মদ আবদুর রউফসহ অভিযান পরিচালনাকারী টিমের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত সকল পুলিশ কর্মকর্তাদের সামনে গ্রেফতারকৃত ছিনতাইকারীরা দেখালেন কি কি পন্থায় তারা মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে ছিনতাই করে থাকেন।

চলন্ত বাস বা মার্কেটে কৃত্রিম ভিড় তৈরি করে পকেট থেকে মোবাইল সরিয়ে নেয়া, ছোঁ মেরে মোবাইল বা ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়া এবং ছোঁরার ভয় দেখিয়ে খুব কম সময়ে ছিনতাইয়ের কয়েকটি কৌশল তারা উপস্তিত পুলিশ কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মী দেখান।

গ্রেফতার ছিনতাইকারী চক্রটির কয়েকজন সদস্যের সাথে কথা বলে জানা যায়, পুরাতন রেলস্টেশন ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন, কাইয়ুম, বদি ও বদির বোন লাকি, আব্দুল জলিল এবং আব্দুস শুক্কুরের মতো আরো বেশ কয়েকজন ভাসমান মোবাইল বিক্রেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব ছিনতাইকারীরা ছিনতাই করে থাকে।

তারা নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে ৪-৫ জন করে গ্রুপ ভিত্তিক ভাগ হয়ে যাত্রী ও সাধারণ পথচারীকে টার্গেট করে তাদের শিকারে পরিণত করে। পরে ছিনতাইকৃত মোবাইলগুলো তাদের আশ্রয় প্রশ্রয়দাতা ভাসমান মোবাইল বিক্রেতাদের হাতে তুলে দেন। বিনিময়ে তারা সামান্য ৩ থেকে ৫শ টাকা হাত খরচ হিসেবে তুলে দেন। তাছাড়া যারা খুব অল্প বয়সী তাদেরকে পড়াশুনার জন্য কিছু টাকা দেন ছিনতাইয়ের নির্দেশদাতারা।

কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন বলেন, রবিবার রাতে গ্রেফতার ছিনতাইকারীদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তারা ৩-৪ গ্রুপে ভাগ হয়ে চুরি-ছিনতাই কাজে জড়িয়ে পড়ে। প্রত্যেকটা গ্রুপের টার্গেট থাকে দিনে অন্তত একটি করে মোবাইল ছিনতাই্ করা। সে টার্গেট নিয়ে তারা জনাকীর্ণ স্থান ও জনগণের ভিড় যে এলাকায় বেশি সেই স্থানকেই তারা বেঁচে নেন।

বিশেষ করে এই নগরীর ইপিজেড, কাস্টমস, বন্দর, দেওয়ানহাট, লালখান বাজার, জিইসি মোড় ২নং গেইট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, আন্দরকিল্লা, টেরিবাজার, নিউমার্কেট ও নতুন রেল স্টেশনসহ নগরের জনহুল স্থানগুলোতে সুযোগ বুঝে মাত্র ৩০ সেকেন্ড থেকে ১-২ মিনিটের মধ্যেই তারা পথচারী ও যাত্রীর মোবাইল ছিনতাই করে সটকে পড়েন।

ওসি বলেন, রেলস্টেশনের আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠা ভাসমান মোবাইল দোকানদারদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে তারা ছিনতাইকাজে জড়িয়ে পড়েন। কয়েকটি মোবাইল চুরির ঘটনার সূত্র ধরে রবিবার রাতভর অভিযান চালিয়ে ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

ওসি বলেন, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রাব্বি আল আহম্মদের বিরুদ্ধে ৫টি, মামুনের বিরুদ্ধে তিনটি, সোহাগের বিরুদ্ধে দুইটি, জয় বড়ুয়ার বিরুদ্ধে চারটি, আজিমের বিরুদ্ধে ১০টি, দেলোয়ারের বিরুদ্ধে আটটি, আল আমিনের বিরুদ্ধে একটি ও বশিরের বিরুদ্ধে দুইটি মামলা রয়েছে।

তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সূত্র ধরে এ ছিনতাইকারী চক্রের আশ্রয় প্রশ্রয়দাতাসহ সকলকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।